মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ৫ বক্সিং ডে টেস্ট

ক্রিকেটের যারা খোঁজ খবর রাখেন বক্সিং ডে নামটার সঙ্গে তারা কম-বেশি পরিচিত।খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিনের পরদিন যে টেস্ট ম্যাচটি হয় তার নামই ‘বক্সিং ডে’ টেস্ট।

১৮৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার ক্লাব দল নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়ার হাত ধরে এই টেস্টের সূত্রপাত হয়। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিসি) বড়দিনের পর দিন অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর ঐতিহ্যবাহী ক্লাব দুটি মুখোমুখি হয়। এই ম্যাচের জন্য দুদলের খেলোয়াড়েরা পরিবারের সঙ্গে বড়দিনের ছুটি উদযাপন করতে পারেনি।

১৯৫০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক বক্সিং ডে টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে। যদিও সেই তখনকার রীতি অনুসারে ৬ দিনের সেই ম্যাচটি শুরু হয়েছিল ২২ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সেই টেস্টের পঞ্চম দিনটিকেই বক্সিং ডে বলা হয়েছিল। প্রথম বক্সিং ডের ওই ম্যাচটি অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ২৮ রানে।এরপর ১৯৮০ সাল থেকে ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া টেস্টর নাম দেয়া হয় বক্সিং ডে টেস্ট।

মূলত মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অন্য যেকোনো একটি দল নিয়ে আয়োজিত হয় এই এতিহ্যবাহী টেস্ট ম্যাচটি । বক্সিং ডে টেস্টে ঐতিহাসিক জয়ের অনেক রেকর্ড রয়েছে ।আজ তুলে ধরা হলো ঐতিহাসিক মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত সেরা পাঁচটি বক্সিং ডে টেস্ট।

মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সেরা ৫ বক্সিং ডে টেস্ট:

১. অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড ,এমসিজি,১৯৮২(ইংলিশরা ৩ রানে জয়ী) 

টেস্ট ম্যাচ হবে আর রোমাঞ্চে থাকবে না তা কি কখনো হয়। যেমনটা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ১৯৮২ সালের বক্সিং ডে টেস্টে। এই টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩ রানের নাটকীয় জয় পেয়েছিল ইংলিশরা। যদিও পুরোটা টেস্ট জুড়ে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলেনি। প্রথম ইনিংসে ইংলিশদের করা ২৮৪ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৩ রানের লিড পায় অস্ট্রেলিয়া। অর্থাৎ ২৮৭তে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও দুর্দান্ত ব্যাটিং করে স্কোরবোর্ডে ২৯৪ রান তোলে ইংলিশরা।

ইংলিশদের দেয়া ২৯২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে কাওয়ান্সের বোলিং তোপে এক পর্যায়ে ২১৮ রানের ৯ উইকেট হারিয়ে হারের জন্য অপেক্ষা করছিল স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া। তবে কে জানতো যে শেষটা হতে যাচ্ছে নাটকীয়। অস্ট্রেলিয়া সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান অ্যালান বোর্ডার লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান জেফ থম্পসনকে নিয়ে ৭০ রানের পার্টনারশিপ গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে ইয়ান বোথামের করা ৯৭ তম ওভারের প্রথম বলটিতে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসেন থম্পসন। আর সেখানে নাটকীয় ভাবে ৩ রানে হেরে যেতে হয় অজিদের। ক্যারিয়ার সেরা ৭৭ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন নরম্যান কাওয়ান্স।

২. অস্ট্রেলিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ,এমসিজি ১৯৮৮, (ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৮৫ রানে জয়ী)

১৯৮০ সাল থেকে অনুষ্ঠিত ৩৬ টি বক্সিং ডে টেস্টের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ২০টি এবং ড্র হয়েছে ৯টি। আর বাকি ৭ টেস্টে হারের মুখ দেখেছে অজিরা। তবে এই টেস্ট ম্যাচটি অবশ্য অন্যগুলো থেকে ছিল কিছুটা ভিন্ন। কারণ এই টেস্ট ম্যাচে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ২৮৫ রানের বিশাল পরাজয় বরণ করে। এই টেস্টের প্রথম ইনিংসে টস জিতে ব্যাটিং করতে নেমে সব উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে ২৮০ রান তোলে উইন্ডিজ।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে ২৪২ এ শেষ হয়ে যায় অজিদের প্রথম ইনিংস। ৩৮ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে নেমে রিচার্ডসনের দুর্দান্ত শতকে অস্ট্রেলিয়াকে ৪০০ রানের বিশাল লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয় ক্যারিবীয়রা। আর চতুর্থ ইনিংসে এত বড় লক্ষ্য পেয়ে যে কোন দলেরই ঘাবড়ে যাওয়ার কথা। ব্যতিক্রম ছিল না স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াও, পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্যাটারসনের বোলিং তোপে ১১৪ রানে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। আর যেখানে ২৮৫ রানের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে উইন্ডিজ।

৩.অস্ট্রেলিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ , এমসিজি, ১৯৯২ (অস্ট্রেলিয়া ১৩৯ রানে জয়ী)

১৯৮৮ সালের বক্সিং ডে টেস্টে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে বড় পরাজয়ের লজ্জায় পড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। আবারও একই মঞ্চে একই প্রতিপক্ষকে পেয়ে এবার আর ভুল করলো না অস্ট্রেলিয়া। এবার সে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ১৩৯ রানের বড় জয় তুলে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিল অজিরা। মেলবোর্নে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া।প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ইতিহাসে অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান মার্ক ওয়াহ ও অ্যালান বোর্ডারের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ভর করে প্রথম ইনিংসে ৩৯৫ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে অস্ট্রেলিয়া।

জবাব দিতে নেমে ২৩৩ রানে শেষ হয়ে যায় ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংস।১৬৩ রানের লিড নিয়ে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯৬ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার দেয়া ৩৫৯ রানের বিশাল সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে ফিল সিমন্স ও রিচার্ডসনের ব্যাটে ভর উদ্বোধনী জুটিতে ১৪৩ রানের পার্টনারশিপ গড়ে উইন্ডিজ। তবে তারা ভুলে গিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়ান দলে সর্বকালের অন্যতম সেরা স্পিনার শেন ওয়ার্ন রয়েছে। এই লেগ স্পিনারের ডান হাতের যাদুতে মাত্র ৭৬ রানের মধ্যে ৯ উইকেট হারিয়ে ২১৯ রানে অলআউট হয়ে যায় উইন্ডিজ। মাত্র ৫২ রানে ৭ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন শেন ওয়ার্ন।

৪. অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড, এমসিজি,২০০৬( অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ৯৯ রানে জয়ী)

 শেন ওয়ার্ন বল হাতে জাদু দেখাবে অথচ অস্ট্রেলিয়া জিতবে না তা কি করে হয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০৬ সালে অ্যাশেজের চতুর্থ টেস্ট যেটি মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত হয়েছিল , সেখানেই নিজের ৭০০ তম উইকেটের ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করেন এই ডানহাতি স্পিনার। অথচ এই টেস্টের প্রথম ইনিংসে টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সফরকারী ইংল্যান্ড। তবে উইকেট চিনতে যে ভুল করেছিল ইংলিশরা তা তাদের স্কোরকার্ড দেখেই স্পষ্ট।

প্রথম ইনিংসে শেন ওয়ার্নের বোলিং তোপে ১৫৯ রানে অলআউট হয়ে যায় অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের দল। তবে ইংল্যান্ড উইকেট চিনতে ভুল করলেও স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া কিন্তু করেনি। নিজেদের স্বভাবসুলভ ব্যাটিং করেছে অজিরা। ম্যাথিউ হেইডেন ও অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসের জোড়া শতকে স্কোরবোর্ডে ৪১৯ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায় অজিরা। আর সেখানে মূলত রান পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে যায় সফরকারী ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা ছিল দ্বিতীয় ইনিংসেও। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬১ রানের বেশি করতে পারেনি ইংলিশরা। আর তাতেই ইনিংস ও ৯৯ রানের ব্যবধানে টেস্ট জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া।দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন।

৫. অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড ,এমসিজি, ২০১০ (ইংল্যান্ড ইনিংস ও ১৫৭ রানের ব্যবধানে জয়ী)

অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের ক্রিকেট দ্বৈরথটা সবারই জানা। অ্যাশেজ হোক বা অন্য যেকোন ম্যাচ কেউ কাউকে একচুল ছাড় দিতেও নারাজ। শুধু তাই নয় হেরে গেলে প্রতিশোধ নিতেও দেরি করে না কোন পক্ষই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০০৬ সালে বক্সিং ডে টেস্টে ইনিংস ও ৯৯ রানের ব্যবধানে হারের দুঃস্বপ্ন ভোলেনি ইংলিশরা।তার প্রমান ২০১০ সালে এমসিজিতে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া -ইংল্যান্ডের মধ্যকার বক্সিং ডে টেস্ট। চার বছর আগের সেই হারের প্রতিশোধ নিয়েছে ইংলিশরা তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। এবার অবশ্য গল্পটা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন।

এবার আর টস জিতে ব্যাটিং না নিয়ে বরং বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ইংলিশ দলপতি জোনাথন ট্রট। আর তার সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল তা প্রমাণ করেছে ইংলিশ বোলাররা। জেমস অ্যান্ডারসন ও ট্রেমলেটের বোলিং তোপে মাত্র ৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া।অস্ট্রেলিয়া ব্যাটসম্যানরা না পারলেও ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা অবশ্য একি পিছে ব্যাট হাতে দেখিয়েছে দাপট। জোনাথন ট্রটের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৫১৩ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায় ইংলিশরা। ৪১৫ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ২৫৮ রানে অল আউট হয়ে যায় অজিরা। আর সেখানেই ইনিংস ও ১৫৭ রানের বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × two =

shares